ইলিশের ভরা মৌসুম চলছে। এই সময়ে দক্ষিণাঞ্চলের নদ-নদী ও মোকামগুলো রুপালি ইলিশে সয়লাব থাকার কথা। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। বরিশালের নদ-নদীতে ইলিশের দেখা মিলছে না। সমুদ্র সংলগ্ন নদীতে মিলছে না ইলিশ। জেলেদের জালে ছোট-বড় কোনো আকারেরই ইলিশ ধরা পড়ছে না।
বরিশাল অঞ্চলের জেলে ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, নদ-নদীর বিভিন্ন স্থানে নাব্যতা কমে যাওয়ায় ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণ ও প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে সাগর ও নদীর মোহনায় পলি জমে চ্যানেল ভরাট হয়ে যাওয়ায় কোথাও কোথাও তৈরি হয়েছে ডুবোচর। ফলে নদীতে ইলিশের প্রবেশের স্বাভাবিক পথ সংকুচিত হওয়ায় নদীতে ইলিশ মিলছে না। এর সঙ্গে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বেহুন্দি জাল, চায়না দুয়ারিসহ বিভিন্ন অবৈধ জাল দিয়ে মাছ শিকার চলছে বছরজুড়ে অবাধে। এসব জালে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ মাছ ধরা পড়ছে। ছোট ইলিশ ও অন্যান্য মাছের পোনা নির্বিচারে ধরা পড়ায় দীর্ঘমেয়াদে ইলিশের উৎপাদনেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
মৎস্য বিভাগের তথ্যও ইলিশ সংকটের চিত্রকে স্পষ্ট করছে। বরিশাল বিভাগে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ইলিশ উৎপাদন ছিল ৩ লাখ ৭২ হাজার ৩৪৩ টন। পরের অর্থবছরে তা কমে ৩ লাখ ৪৮ হাজার ৮৩৪ টনে দাঁড়ায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন আরও কমে হয় ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৭৮৩ টন। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে ২ লাখ ৬৬ হাজার ৫৯৭ টনে।
বরিশালের সবচেয়ে বড় মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র পোর্ট রোডের মোকামেও ব্যস্ততা ধারাবাহিকভাবে কমেছে। বর্তমানে একেবারেই নেই আগের সেই চিরচেনা ব্যস্ততা। ব্যবসায়ীদের হিসাবে, ভরা মৌসুমে যেখানে প্রতিদিন শত শত মণ ইলিশ আসার আসত, সেখানে আমদানি খুবই সামান্য। সরবরাহ কম থাকায় ইলিশের দাম আকাশচুম্বী।
কীর্তনখোলা, আড়িয়াল খাঁ, মেঘনা, তেঁতুলিয়া, কালাবদর,পায়রা, বিশখালী, সন্ধ্যাসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন নদীতে কমেছে ইলিশের আহরণ। জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইলিশ একবারেই পাচ্ছেন না তারা। দিনভর নদীতে জাল ফেলেও দেখা মিলছে না ইলিশের ।
মেহেন্দিগঞ্জের জেলে বলেন রফিক মাঝি বলেন, ‘আগে এই সময়ে নদীতে নামলে জালে মনকে মন ইলিশ উঠত। এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা জাল ফেলেও ইলিশ মাছ পাওয়া যায় না। তেল, বরফ ও খাবারের খরচ উঠিয়ে আনা যাচ্ছে না।
বাউফলের জেলে আইউয়ুব আলী বলেন, ‘ইলিশ না পাওয়ায় ধারদেনা করে সংসার চালাতে হচ্ছে। নদীতে মাছ কমে গেলে আমাদের মতো জেলেদের আর কোনো পথ থাকে না। এজন্য ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সরকারী উদ্যোগ নেয়া দরকার।
বরিশালের পোর্ট রোডের ব্যবসায়ীরা জানান, এ বছর নদীর ইলিশের সরবরাহ নিয়ে তারা হতাশ। বসায়ীরা জানান, এ সময়ে যেখানে প্রতিদিন ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ মণ ইলিশ আসার কথা, সেখানে মাত্র ১০০ থেকে ১৫০ মণ মাছ আসছিল।
ইলিশের সংকটের অন্যতম আলোচিত কারণ এখন নিষিদ্ধ ও ক্ষতিকর বিভিন্ন ধরনের জাল। বিশেষ করে বেহুন্দি জাল নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। অতি সূক্ষ্ম ফাঁসের এসব জালে বড় মাছের পাশাপাশি ছোট মাছ, মাছের পোনা ও অন্যান্য জলজ প্রাণীও আটকা পড়ে। ফলে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ও বেড়ে ওঠার সুযোগ কমে গেছে। চায়না দুয়ারি, বেহুন্দি ও অন্যান্য ক্ষতিকর জালের ব্যবহার বন্ধের পাশাপাশি ইলিশের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র রক্ষা, জাটকা সংরক্ষণ, নদীর নাব্যতা ও পানিপ্রবাহ ঠিক রাখার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি।
অধিকাংশ জেলেদের অভিযোগ, নদীর বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ জাল দিয়ে মাছ শিকার করা হলেও সব জায়গায় নিয়মিত নজরদারি ও অভিযান হয় না।মৎস্যসংশ্লিষ্টদের মতে, ইলিশের জীবনচক্রের সঙ্গে নদী ও সাগরের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু নদী থেকে সাগর পর্যন্ত ইলিশের স্বাভাবিক চলাচলের পথে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছেনদীর তলদেশে পলি জমে কোথাও কোথাও চ্যানেল সংকুচিত হয়েছে। সৃষ্টি হচ্ছে ডুবোচর। এতে নদীর পানিপ্রবাহ ও গভীরতা পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণপথে প্রভাব পড়ছে।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাৎস্য বিজ্ঞান অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. মোঃ সাজেদুল হক বলেন , “বেহুন্দি জাল, চায়না দুয়ারি জালসহ বিভিন্ন অবৈধ জাল দিয়ে মাছ শিকারের ফলে ইলিশের উৎপাদন উদ্বেগজনকভাবে কমেছে। জলবায়ু পরিবর্তন, নদী দখল দূষন হচ্ছে। সাগর ও নদীর সংযোগস্থলে নাব্য সংকট দেয়া দিয়েছে। অনেক ডু্বোচরের সৃষ্টি হয়েছে। এতে ইলিশের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। সাগর ও মোহনায় ড্রেজি করে নাব্য সংকট দূর করে ইলিশের স্বাভাবিক চলাচলের পথ নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া ইলিশ আহরণ নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেদের আর্থিক সহায়তা দিয়ে অভিযান কঠোর ভাবে পালন করে ইলিশ প্রজনন নিশ্চিত করতে হবে।
বরিশাল জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, এবার ইলিশের পরিমাণ কম অনেক বেশি কমে গেছে। বেহুন্দি,চায়না দুয়ারিসহ বিভিন্ন অবৈধ জাল দিয়ে মাছ শিকারের বিরুদ্ধে অভিযান আরও জোরদার করা হবে। সাগর ও নদীর মোহনায় নাব্য সংকটের দূর করতে মৎস বিভাগের প্রস্তাবে সরকার প্রথমবার শুধু ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য ডেজিংয়ের উদ্যোগ নিয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে ড্রেজিংয়ের কাজ শুরু হবে এবং ইলিশ স্বাভাবিকভাবে নদীতে প্রবশে করতে পারবে।