বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জে তীব্র লোডশেডিংয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত। স্থানীয়দের দাবি, ২৪ ঘণ্টায় গড়ে মাত্র ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যায়। বাকি সময় বিদ্যুৎহীন অবস্থায় কাটছে প্রায় ৫ লাখ মানুষের জীবন। এতে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা কার্যক্রম, কৃষি উৎপাদন, স্বাস্থ্যসেবা, বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ ও যানবাহন চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মধ্যেও অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগে ক্ষোভ বাড়ছে গ্রাহকের।
উপজেলায় প্রায় ৫৫ হাজার বিদ্যুৎ গ্রাহক রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, শীত মৌসুম ছাড়া কখনোই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সেবা দেখেননি এ অঞ্চলের মানুষ। সামান্য বৃষ্টি হলেই বিদ্যুৎ চলে যায়। আর ঝড় বা বন্যার সময় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে দুই থেকে তিন দিন, কখনো তারও বেশি সময় লেগে যায়।
বিদ্যুতের অভাবে পৌরসভার পানি সরবরাহও বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন গ্রাহকরা। তাদের অভিযোগ, আগের তুলনায় বিদ্যুৎ ব্যবহার কম হলেও বিল আসছে দ্বিগুণ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তিনগুণ।
স্থানীয় বাসিন্দা জাহিদ হাসান বলেছেন, ‘জুন মাসে বিদ্যুৎ বিল এসেছিল ৫৫৮ টাকা। কিন্তু জুলাই মাসে বিদ্যুৎ বিল দেখানো হয়েছে ২ হাজার ২৭৭ টাকা। পরে মিটারের সঙ্গে রিডিং মিলিয়ে অফিসে আসার পর জানতে পারি ১০০ ইউনিট বেশি লেখা হয়েছে। এরপর কর্তৃপক্ষ বিষয়টি আমলে নিয়ে পুনরায় বিল ধার্য করেছেন।’
ফার্মেসি মালিক শরীফ হাসান বলেন, ‘এখন আর আমাদের এলাকায় বিদ্যুৎ যায় না, মাঝেমধ্যে আসে। ১০ মিনিট বিদ্যুৎ থাকলে আবার ২ ঘণ্টা লোডশেডিং থাকে। অসুস্থ মানুষ চিকিৎসা নিতে আসে, কিন্তু বিদ্যুতের অভাবে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারে না। সব মিলিয়ে চরম দুর্ভোগ তৈরি হয়েছে।’
স্থানীয় বাসিন্দা ও অটোরিকশাচালক উজ্জ্বল বললেন, ‘আমাদের অটো পুরোপুরি বিদ্যুৎনির্ভর। একটানা ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা চার্জ করতে পারলে পরের দিন রাস্তায় নামতে পারি। কিন্তু রাতেও ঠিকমতো একটানা ২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। চার্জ পূর্ণ না হওয়ায় গাড়ি চলাচল বন্ধ হচ্ছে। পরিবারের খরচ মেটাতে এখন হিমশিম খেতে হচ্ছে।’
শিক্ষার্থী বর্না জানালেন, অনার্স প্রথম বর্ষের পরীক্ষা ও এইচএসসি পরীক্ষা চলমান। এমন সময়ে ধারাবাহিক লোডশেডিংয়ের কারণে পড়ালেখায় ব্যাঘাত ঘটছে। পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে শিক্ষার্থীদের।
স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মাহিন বাপ্পী মন্তব্য করেন, ‘রেস্টুরেন্টের খাবার তৈরি করার জন্য ব্যবহৃত বেশিরভাগ মেশিন বিদ্যুৎচালিত। বিদ্যুৎ না থাকলে এগুলো অকার্যকর। গত এক সপ্তাহে রেস্টুরেন্টের খাবার বিক্রিতে ধস নেমেছে। এতে আর্থিক ক্ষতির শিকার হতে হচ্ছে।’
মেহেন্দিগঞ্জ কম্পিউটার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মুরাদ চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের সব ধরনের কাজ বিদ্যুৎ ও অনলাইননির্ভর। বিদ্যুৎ না থাকার কারণে আমাদের এ ব্যবসায় ধস নেমেছে। অনেকটা বেকার সময় পার করছি।’
এ বিষয়ে মেহেন্দিগঞ্জ আঞ্চলিক বিদ্যুৎ অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মোস্তাফিজুর রহমান জানান, ৫৫ হাজার গ্রাহকের বিদ্যুৎ চাহিদা ১১ মেগাওয়াট হলেও বর্তমানে সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ৫ মেগাওয়াট। এ কারণেই দীর্ঘ লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।
অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বললেন, ‘সরকার বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করায় পূর্বের তুলনায় বিল কিছুটা বেশি হয়েছে। যদি কারও মনে হয় বিদ্যুৎ বিল স্বাভাবিকের তুলনায় অতিরিক্ত এসেছে, তবে অফিসে যোগাযোগ করলে আমরা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’
নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয়ে তিনি স্পষ্ট করেন, ‘প্রায় ৫৭ কিলোমিটার দূর থেকে তিনটি নদীর তলদেশ হয়ে মেহেন্দিগঞ্জে বিদ্যুৎ সংযোগ এসেছে। এতে কোনো একটি স্থানে বিচ্যুতি ঘটলে পুরো উপজেলার বিদ্যুৎ বন্ধ হয়ে যায়। কাজিরহাট থানায় একটি পাওয়ার গ্রিড নির্মাণ করা গেলে বিদ্যুৎ সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে।’



