সোমবার, সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬
No menu items!
spot_img

ডেঙ্গু আক্রান্তে শীর্ষে পিরোজপুর, হাসপাতালের মেঝেতে চলছে চিকিৎসা

বরিশাল বিভাগে ডেঙ্গুর প্রকোপ ক্রমেই বাড়ছে। চলতি বছরের শুরু থেকে শুরু হওয়া সংক্রমণ এখন বিভাগের ছয় জেলাতেই ছড়িয়ে পড়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী এ পর্যন্ত নয় হাজার ৪১৬ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে মারা গেছেন ১৩ জন। সবচেয়ে বেশি ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে ঝালকাঠিতে। আর পিরোজপুরে মারা গেছেন তিনজন। এছাড়া বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বরগুনার চারজনের মৃত্যু হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্তের হিসাবে বিভাগে সবচেয়ে এগিয়ে পিরোজপুর। জেলাটিতে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দুই হাজার ৪৬৪ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন দুই হাজার ২৯৮ জন। এখনো চিকিৎসাধীন আছেন ১৬৫ জন।

রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় পিরোজপুরের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। পর্যাপ্ত শয্যা না থাকায় জেলা সদর হাসপাতালে রোগীদের মেঝেতেও চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

বিভাগের মধ্যে ডেঙ্গু আক্রান্তে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ঝালকাঠি জেলা। এ জেলায় চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে দুই হাজার ১৬ জন। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন এক হাজার ৯৬০ জন। এখনো চিকিৎসাধীন আছেন ৫৫ জন।

বিভাগে ডেঙ্গু আক্রান্তে তৃতীয় স্থানে রয়েছে পটুয়াখালী জেলা। এ জেলার বিভিন্ন উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছে এক হাজার ৩৬২ জন। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন এক হাজার ২৫৮ জন। এখনো চিকিৎসাধীন আছেন ১০৪ জন।

ডেঙ্গু আক্রান্তে চতুর্থ স্থানে রয়েছে বরগুনা জেলা। এ জেলার শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বিভিন্ন উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছে এক হাজার ২৭৭ জন। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন এক হাজার ১৭৬ জন। এখনো চিকিৎসাধীন আছেন ১০১ জন।

বিভাগে ডেঙ্গু আক্রান্তে পঞ্চম স্থানে রয়েছে বরিশাল জেলা। এ জেলার হাসপাতাল ও বিভিন্ন উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বছরের শুরু থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছে ৯১১ জন। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৮৪৩ জন। এখনো চিকিৎসাধীন আছেন ৬৮ জন।

বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে কম ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে ভোলা জেলায়। এ জেলার হাসপাতাল ও বিভিন্ন উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছে ৫৬৬ জন। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৫২৭ জন। এখনো চিকিৎসাধীন আছেন ৩৯ জন।

এ ছাড়া বিভাগের বিভিন্ন স্থান থেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৮০২ জন। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৬৪২ জন। এখনো চিকিৎসাধীন আছেন ১৬৭ জন।

বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা দেলোয়ার হোসেন বলেন, প্রতিটি বেডের জন্য একটি করে মশারি দেওয়া হয়। রোগীর সংখ্যা বেড়ে গেলে অতিরিক্ত মশারি পাওয়া যায় না। আবার অনেক রোগী মশারি পেলেও তা নিয়ম অনুযায়ী ব্যবহার করেন না। ডেঙ্গু প্রতিরোধে এ বিষয়ে সবাইকে আরও সচেতন হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন জাগো নিউজকে বলেন, নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি নয়। তা ছাড়া বরিশাল জেলা ও নগরীতে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর ঘটনাও নেই। শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় যারা মারা গেছেন, তারা সবাই অন্যান্য জেলার বাসিন্দা।

তিনি জানান, ডেঙ্গু প্রতিরোধে নগরীর বিভিন্ন পুকুর, ডোবা ও ৩০টি ওয়ার্ডের ড্রেন পরিষ্কার করা হচ্ছে। পাশাপাশি স্কুল-কলেজে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি ফগার মেশিন দিয়ে প্রতিদিন মশক নিধন কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পিরোজপুর জেলায় হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪০ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হচ্ছেন। ১০০ শয্যার জেলা হাসপাতালে প্রতিদিনই বিপুলসংখ্যক রোগীকে ডেঙ্গুর চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। ফলে পর্যাপ্ত শয্যা না থাকায় হাসপাতালের মেঝেতেও রোগীদের চিকিৎসা নিতে দেখা গেছে। এতে রোগী ও স্বজনদের দুর্ভোগও বেড়েছে।

হাসপাতালে ভর্তি নাজমা বেগম বলেন, কয়েক দিন ধরে তিনি দুর্বলতা, ক্লান্তি ও বমি বমি ভাব অনুভব করছেন। হাসপাতালে রোগীর চাপ বেশি হওয়ায় থাকার জায়গা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা পেতে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।

আরেক রোগীর স্বজন ফাতেমা বেগম বলেন, তার নাতির শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় হাসপাতালে ভর্তি করেছেন। কিন্তু কোনো শয্যা খালি না থাকায় মেঝেতে চাদর বিছিয়ে তাকে রাখতে হচ্ছে।

পিরোজপুরের সিভিল সার্জন ডা. মো. মতিউর রহমান বলেন, মশক নিধন কার্যক্রমে কিছুটা ধীরগতি রয়েছে। তবে জেলা সদর হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে পর্যাপ্ত ওষুধ ও স্যালাইনের মজুত রয়েছে। ডেঙ্গু পরীক্ষার অ্যান্টিজেন কীটও সরবরাহ করা হচ্ছে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় রোগীদের বিনা মূল্যে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, পিরোজপুরে প্রচুর সুপারি ও নারকেল গাছ রয়েছে। কাটা গাছের গোড়ায় জমে থাকা পানি এডিস মশার বংশবিস্তারের অন্যতম স্থান হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি নারকেলের খোসা, ভবনের ছাদ, নির্মাণাধীন ভবন, নালা ও নার্সারির টবেও এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে পৌরসভা ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে মশক নিধন কার্যক্রম আরও সক্রিয় করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

অপরদিকে ঝালকাঠিতে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকায় উদ্বেগ জানিয়েছেন জেলার সিভিল সার্জন ডা. হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, ঝালকাঠি পৌরসভার কাঠপট্টি, বান্দাঘাট, বাঁশপট্টি, কলাবাগান, স্টেশন রোড, সিটি পার্ক ও ফকিরবাড়িসহ মোট নয়টি এলাকাকে ডেঙ্গুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ডেঙ্গুর বিস্তার ঠেকাতে এসব এলাকায় জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. মো. রেফায়েতুল হায়দার জাগো নিউজকে বলেন, আগে বরিশাল বিভাগের ডেঙ্গুর হটস্পট হিসেবে বরগুনাকে চিহ্নিত করা হলেও এবার সেখানে আক্রান্তের সংখ্যা কমেছে। চলতি বছর পিরোজপুরে সবচেয়ে বেশি রোগী পাওয়া যাচ্ছে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ঝালকাঠি।

তিনি আরও বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে মানুষের সচেতনতা কিছুটা বেড়েছে। তবে আরও সচেতনতা প্রয়োজন। পাশাপাশি ইউনিয়ন, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের দায়িত্বশীলদের মশক নিধন কার্যক্রম আরও জোরদার করতে হবে।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular