চারদিকে ইটের দেয়াল, ওপরে টিনের ছাউনি। ঘরটিতে নেই স্বাভাবিকভাবে চলাচলের কোনো দরজা। জানালার মতো ছোট একটি অংশে বসানো লোহার গ্রিল। সেই গ্রিলের ফাঁক দিয়েই দেওয়া হয় খাবার। এভাবেই ছোট্ট একটি ঘরে বন্দিজীবন কাটছে সামিম হাওলাদার নামের এক যুবকের।
একসময় পায়ে শিকল পরিয়ে রাখা হলেও গত আট বছর ধরে তিনি রয়েছেন ঘরবন্দী। সব মিলিয়ে প্রায় ১২ বছর ধরে স্বাভাবিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন এই যুবক।
বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার কেদারপুর ইউনিয়নের সাড়ে পাঁচ আনী গ্রামের বাসিন্দা সামিম। একসময় মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে দাখিল ও আলিম পাস করেছিলেন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতেন। ছিল সংসারও। বিয়ে করেছিলেন, জন্ম হয়েছিল একটি কন্যাসন্তানের।
কিন্তু হঠাৎ মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলায় বদলে যায় তার জীবনের চিত্র। একসময় স্ত্রী মেয়েকে নিয়ে চলে যান অন্যত্র। আর সামিমের ঠিকানা হয়ে ওঠে চার দেয়ালের ছোট্ট একটি ঘর। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রায় ১২ বছর আগে হঠাৎ মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন সামিম। প্রথম দিকে গ্রামের রাস্তাঘাটে মানুষকে মারধর করতেন।
একপর্যায়ে পরিবারের সদস্যদের ওপরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন। বাবা-মা ও ভাইদের মারধর করতেন। এমন পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে প্রথমে তার পায়ে শিকল পরিয়ে রাখা হয়। পরে পরিবারের সদস্যরা বাড়ির পাশে ইটের দেয়াল দিয়ে টিনের একটি ছোট ঘর তৈরি করে দেন। সেই ঘরেই শুরু হয় তার বন্দিজীবন।সরেজমিনে দেখা যায়, ঘরটির একমাত্র প্রবেশপথে রয়েছে লোহার গ্রিল।
সেই গ্রিলের ফাঁক দিয়ে নিয়মিত খাবার দেওয়া হয় তাকে। সামিম সেখানে থাকতেই অভ্যস্ত হয়ে গেছে। কেউ ডাক দিলে গ্রীলের সামনে এসে স্বাভাবিক কথা বলে। এভাবেই কেটে গেছে বছরের পর বছর। স্বাভাবিক মানুষের মতো বাইরে বের হওয়া, প্রতিবেশীদের সঙ্গে মেলামেশা কিংবা খোলা আকাশের নিচে সময় কাটানোর সুযোগ নেই তার। তিনি গ্রীলের ফাঁক থেকেই কোরআন তেলওয়াত করে শোনান। প্রতিবেশী হৃদয় বলেন, সামিম ভাই একসময় এই এলাকার মধ্যে খুব ভালো মানুষ ছিলেন।
হঠাৎ মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। এরপর থেকেই তাকে ঘরবন্দী করে রাখা হয়েছে। কী কারণে এমন হয়েছে, তা আমরা জানি না। সামিমের চাচাতো ভাই বাবুল হোসেন বলেন, পড়াশোনা শেষ করে ভালোই সংসার জীবন শুরু করেছিলেন সামিম। কিন্তু একসময় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। এরপর যাকে সামনে পেতেন, তাকেই মারধর করতেন। তার মেয়েকেও দা নিয়ে ধাওয়া করেছিলেন। তাকেও ধাওয়া করেছেন। পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি গ্রামের মানুষও তার আক্রমণের শিকার হয়েছেন।
এ পরিস্থিতিতে এলাকার লোকজনের সঙ্গে আলোচনা করে তাকে ঘরবন্দী রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সামিমের বাবা সত্তরোর্ধ্ব কালাম হাওলাদার ছেলের চিকিৎসার জন্য নিজের সাধ্যমতো চেষ্টা করেছেন। জমি বিক্রি করেছেন, ধারদেনা করে বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা করিয়েছেন। কিন্তু ছেলের সুস্থতা ফেরেনি। এখন নিজেও পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। কালাম হাওলাদার বলেন, ছেলের চিকিৎসার জন্য জমি বিক্রি করেছি, মানুষের কাছ থেকে ধারদেনা করেছি। বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা করিয়েছি। কিন্তু কোনো কূলকিনারা পাইনি। এখন আমিও প্যারালাইজড। কী করব, বুঝতে পারছি না।
এদিকে দীর্ঘদিন ধরে একজন শিক্ষিত যুবকের এভাবে ঘরবন্দী থাকার খবর জানতে পেরে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। বাবুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসমা উল হুসনা বলেন, আলিম পাস করা একজন মানুষ এভাবে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গৃহবন্দী অবস্থায় রয়েছেন, বিষয়টি সত্যিই হৃদয়বিদারক। সংবাদকর্মীদের মাধ্যমে বিষয়টি জানার পর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দিয়েছি। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাধ্যমতো সহযোগিতা করা হবে।
প্রাথমিকভাবে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও খাদ্যসামগ্রী দিয়ে তার পাশে থাকার চেষ্টা করা হবে। প্রায় এক যুগ ধরে ছোট্ট একটি ঘরেই আটকে আছে সামিমের জীবন।
একসময় যার ছিল সংসার, স্বাভাবিক জীবন ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন, আজ তার পৃথিবী সীমাবদ্ধ কয়েকটি দেয়ালের মধ্যে। পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতা, বাবার অসুস্থতা এবং দীর্ঘদিনের চিকিৎসা-সংকটের মধ্যে সামিমের জীবনে আবারও স্বাভাবিকতা ফিরবে কি না, সেই প্রশ্নই এখন সামনে।



