বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলাধীন মেঘনা নদীর ভয়াল গ্রাসে একের পর এক বিলীন হচ্ছে বসতঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থাপনা। পাঁচ দিনের ব্যবধানে উপজেলার চরগোপালপুর ও আলিমাবাদ ইউনিয়নে ৪১টি বসতঘর ও বাজারের প্রায় ৩০টির মতো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল জেলার আওতাধীন আটটি নদীর ২০০ কিলোমিটারজুড়ে চলছে নদীভাঙন। যার মধ্যে মেঘনা, তেঁতুলিয়া, কীর্তনখোলা, আড়িয়াল খাঁ, সন্ধ্যা, সুগন্ধা, কারখানা ও জয়ন্ত নদীর ৬০ কিলোমিটারজুড়ে চলছে তীব্র ভাঙন।
ভাঙনে এরই মধ্যে বাবুগঞ্জ, মুলাদী, হিজলা, মেহেন্দিগঞ্জ, বাকেরগঞ্জ, উজিরপুর ও বানারীপাড়ার অসংখ্য বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, ফসলি জমি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা নদীগর্ভে তলিয়ে গেছে।
স্থানীয়দের দাবি, পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে জিও ব্যাগ ফেলা হলেও তা ভাঙন রোধে কাজে আসছে না। বরং নদীর তীব্র স্রোত আর ভাঙনের প্রভাবে মাটির সাথে নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে জিও ব্যাগও। এ কারণে ভাঙনের ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোর মূল্যবান সম্পদ দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে বলেছে প্রশাসন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার চরগোপালপুর ইউনিয়নে গত পাঁচ দিনের ব্যবধানে সৈয়দ মাস্টার বাড়ির পাঁচটি বসতঘর, নীলগাজী বাড়ির আটটি, রাড়ী বাড়ির সাতটি, তালুকদার বাড়ির চারটি, বেপারী বাড়ির তিনটি, ধোপাবাড়ির পানের বরজসহ দুটি বসতঘর, মাধবপুর বাড়ির চারটি ও গণি রাড়ী বাড়ির আটটি বসতঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
একই সময়ে ঢোলের হাটের প্রায় ৩০টির মতো দোকান মেঘনা নদীতে ভেসে গেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান সামসুল বারী।
তিনি জানান, ২০২২-২৩ অর্থ বছর থেকে এ এলাকায় ভাঙন রোধে প্রায় এক লাখ জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে। কিন্তু তা কোনো কাজে আসছে না। বরং তীব্র স্রোতে নদীগর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে জিও ব্যাগও। ভাঙনের কারণে এখন লেঙ্গুটিয়া মুসলিম মাধ্যমিক বিদ্যালয়, লেঙ্গুটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ আশপাশের অনেক বসতবাড়ি ও স্থাপনা হুমকির মুখে রয়েছে। এই এলাকায় এখন জরুরি ভিত্তিতে ব্লক বা টেকসই বাঁধ নির্মাণ জরুরি হয়ে পড়েছে।
এদিকে নদীভাঙনের তীব্রতা দেখতে গত বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) চরগোপালপুর ইউনিয়নের নদীভাঙন এলাকা পরিদর্শন করেছেন বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার মো. খলিল আহমেদ। সেখানে চরগোপালপুর ও আলিমাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, মেম্বারদের সঙ্গে তিনি মতবিনিময় করেন।
এ সময় তিনি নদীভাঙনের ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোর মূল্যবান সম্পদ প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয়দের স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে পরামর্শ দিয়েছেন।
বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল জেলায় মোট নদ-নদীর সংখ্যা ৩৮টি। এসবের মোট আয়োতন ৭১৬ কিলোমিটার। বর্ষা মৌসুমে প্রায় ২০০ কিলোমিটারজুড়ে নদী ভাঙন হয়। এদের মধ্যে বর্তমানে ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে ৮টি নদীর ৬০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে।
এর মধ্যে মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর তীরবর্তী মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার চরগোপালপুর, চর মিঠুয়া, দড়িরচর খাজুরিয়া, আদর্শ নগর, আন্দারমানিক, জাহাঙ্গালিয়া ইউনিয়নের চর একরিয়া এবং দক্ষিণ উলানিয়ায় তীব্র ভাঙন চলছে।
অন্যদিকে মেঘনার তীরবর্তী মেমানিয়া, হিজলা গৌরব্দী ও মাঝেরচর, কীর্তনখোলা নদীর তীরবর্তী বরিশাল সদর উপজেলার চরমোনাই ইউনিয়নের ইছাগুঁড়া, চরবাড়িয়া ইউনিয়নের কিছু অংশ ও আড়িয়াল খাঁ নদীর তীরবর্তী শায়েস্তাবাদে ব্যাপক ভাঙন হচ্ছে।
অন্যদিকে বাবুগঞ্জ উপজেলাধীন আড়িয়াল খাঁ, সন্ধ্যা ও সুগন্ধা নদীর ভাঙন বেড়েছে কয়েকগুণ। এরই মধ্যে বিলীন হয়েছে মীরগঞ্জ থেকে ছোট মীরগঞ্জের সিংহেরকাঠি, ওলানকাঠি ও রফিয়াদী গ্রাম। কেদারপুর ইউনিয়নের ভূতেরদিয়া এলাকার মোল্লারহাট, চরমলেঙ্গা, নতুন হাট, আগরপুর ইউনিয়নের গ্রামবাংলা স্কুল সংলগ্ন এলাকা এবং বাহেরচরেও ভাঙন চলছে। মীরগঞ্জ এলাকায় ১০টি বসতঘর একসঙ্গে বিলীন হয়ছে সন্ধ্যা নদীতে।
এসব এলাকায় মাঝে মধ্যে জিও ব্যাগ ফেলা হলেও তা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ভাঙনের তীব্রতার সাথে নদীগর্ভে জিও ব্যাগ বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে, সন্ধ্যার ভাঙনে বিলীন হচ্ছে উজিরপুরের জনপদ। উপজেলার শিকারপুর, গুঠিয়া ইউনিয়নের দাসেরহাট, কমলাপুর, আশোয়ার, চৌধুরীর হাট ও কালিরবাজার বেড়িবাঁধ এলাকা ও বরাকোঠা ইউনিয়নের নারিকেলীসহ নদীতীরবর্তী বেশ কিছু এলাকায় তীব্র ভাঙন চলছে। দীর্ঘদিন ধরে নদীভাঙনে এসব এলাকার অনেক পরিবার বসতভিটা ও আবাদি জমি হারিয়েছে। কোথাও কোথাও ঘরবাড়ি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে আগেই। নদী তীরবর্তী সড়ক, বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মন্দিরসহ বিভিন্ন স্থাপনাও রয়েছে ঝুঁকিতে। শিকারপুরে নদীভাঙনের কারণে বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা স্থানীয়দের মধ্যে।
অন্যদিকে বানারীপাড়া উপজেলার উত্তরকূল, মসজিদ বাড়ি এলাকায় সন্ধ্যা নদীর তীব্র ভাঙনের মুখে পড়েছে। এরই মধ্যে অসংখ্য ফসলি জমি, গাছপালা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙন এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে অনেক ঘরবাড়ি।
এছাড়া আড়িয়াল খাঁ ও জয়ন্তী নদীর তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে মুলাদী উপজেলার শফিপুর, নাজিরপুর, জালালপুর, সেলিমপুর এবং বাটাজোর এলাকায়।
অন্যদিকে, কারখানা, পান্ডব, রাঙামাটি নদীর ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। এ কারণে নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বাকেরগঞ্জ উপজেলার একের পর এক গ্রাম। এর মধ্যে তীব্র ভাঙন চলছে ফরিদপুর ইউনিয়নের দুর্গাপাশা, কবাই, কলসকাঠি, দুধল ইউনিয়নের সতরাজ বাজার, কবাই ইউনিয়নের দক্ষিণ শিয়ালঘনী গ্রামের ইটখোলা বাজার এলাকায়, কবাই বাজার, লক্ষ্মীপাশা বাজার, কলশকাঠি ইউনিয়নের সাদীশ, আমতলী, দক্ষিণ নারায়াঙ্গল গ্রাম, ধাপরকাঠী বাজার নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
এরই মধ্যে লক্ষ্মীপাশা বাজার এলাকার লক্ষ্মীপাশা মাধ্যমিক বিদ্যালয়, লক্ষ্মীপাশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, লক্ষ্মীপাশা বাজার, ফেরিঘাট, কবাই খেয়াঘাট ও বাজার, কলসকাঠীতে মসজিদসহ বিভিন্ন স্থাপনা নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে। এসব এলাকায় দীর্ঘ বছর ধরে ভাঙন চললেও প্রতিরোধে স্থায়ী উদ্যোগ নেই পানি উন্নয়ন বোর্ডের।
বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাবেদ ইকবাল বলেন, ‘বর্ষাকাল হওয়ায় জেলার বিভিন্ন নদ-নদীর প্রায় ২০০ কিলোমিটারজুড়ে ভাঙন চলছে। এর মধ্যে ভাঙনের তীব্রতা বেশি ৬০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে। এসব এলাকায় আমাদের জরুরি আপৎকালীন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে জিও ডাম্পিং কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তবে কিছু কিছু জায়গায় জিও ব্যাগে ভাঙন রোধ না হওয়ার বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। মূলত যে পরিমাণ জিও ব্যাগ ডাম্পিং করা দরকার প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের অভাবে তা সম্ভব হচ্ছে না।’
নদীভাঙন কবলিত এলাকায় আপাতত বড় কোনো প্রকল্পের সম্ভাবনা নেই জানিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘সন্ধ্যা-সুগন্ধা নদীর ভাঙন থেকে উজিরপুর ও বাবুগঞ্জ উপজেলা রক্ষায় ৯৩৮ কোটি টাকার ১৫ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ এবং নদীশাসন প্রকল্প প্রি-একনেকে অনুমোদন হয়েছে। বর্তমানে সেটি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। একনেক অনুমোদন দিলে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হবে।’
এ প্রকল্পের ফলে উজিরপুর উপজেলার গুঠিয়া ইউনিয়নের চতলবাড়ি, বাবুগঞ্জ উপজেলার বিমানবন্দর, সাধুকাঠি, উজিরপুরের রফিয়াদী এবং শিকারপুর বন্দর নদী ভাঙন থেকে রক্ষা পাবে বলে জানান তিনি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের এই কর্মকর্তা আরও জানান, বর্তমানে কয়েকটি উপজেলায় বিভিন্ন নদীর ৩৫ কিলোমিটার তীর রক্ষা ও বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প চলমান রয়েছে। যার মধ্যে হিজলা উপজেলায় হরিনাথপুর-বাউশিয়া, পুরাতন হিজলা এলাকায় মেঘনা শাখা নদীতে আট কিলোমিটার, মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার শ্রীপুর, সদর, চাঁনপুর, দক্ষিণ উলানিয়া এলাকায় তেঁতুলিয়া নদীতে সাড়ে ১১ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ কাজ চলমান।
এছাড়া বাকেরগঞ্জ উপজেলাধীন পায়রা নদীতে সেনানিবাস এলাকায় সাড়ে আট কিলোমিটার এবং দুর্গাপাশায় তেঁতুলিয়া নদীর পাঁচ কিলোমিটার তীর রক্ষার কাজ চলমান।
বরিশাল সদর উপজেলার লামচড়ি, চরমোনাই, চরকাউয়া, হিরন নগর, চাঁদমারী এবং জাগুয়া এলাকায় আট কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নদী ভাঙন রোধে বাঁধ এবং নদী শাসনের কাজ চলমান রয়েছে। এসব কাজ শেষ হলে বরিশালের বড় একটি অংশে নদীভাঙন রোধ পাবে বলে আশাবাদী পানি উন্নয়ন বোর্ডের ওই কর্মকর্তা।
এর আগে মেহেন্দিগঞ্জে নদীভাঙন পরিদর্শনে গিয়ে বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদ বলেন, ‘নদীর পানি ও স্রোত কমে পরিস্থিতি শান্ত হলে শুষ্ক মৌসুমে, বিশেষ করে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষায় জরুরি ব্লক স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
আপাতত নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মধ্যে চাল, ডাল, তেল, লবণসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি জেলেদের ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় জাল সরবরাহ করা হয়েছে।