সুগন্ধা ও বিষখালী নদীর পাড়ে সারি সারি নৌকা। কোথাও বাঁধা নৌকা, কোথাও জাল শুকাতে ব্যস্ত জেলেরা। এই সময়ে নদীতে থাকার কথা ইলিশ ধরার ব্যস্ততায়। কিন্তু এবার কাঙ্ক্ষিত ইলিশ না পাওয়ায় দুশ্চিন্তায় ঝালকাঠির জেলেরা।
সদর উপজেলার পোনাবালিয়া, দেউরি, বাদুরতলা ও চল্লিশকাউনিয়া এবং নলছিটির মাটিভাঙ্গা এলাকার জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা নদীতে জাল ফেলেও আশানুরূপ ইলিশ মিলছে না। দিনভর মাছ ধরে যে আয় হচ্ছে, তাতে নৌকার জ্বালানি, বরফ, জালসহ মাছ ধরার খরচই ঠিকমতো উঠছে না।
ইলিশের মৌসুমকে সামনে রেখে অনেক জেলে নৌকা ও জাল মেরামত কিংবা নতুন জাল কিনতে এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছেন। কেউ কেউ মহাজনের কাছ থেকে নিয়েছেন দাদন। তাদের আশা ছিল, মৌসুমে ভালো ইলিশ পেলে মাছ বিক্রির আয় দিয়ে ঋণ ও দাদনের টাকা পরিশোধ করবেন। কিন্তু মাছ কম পাওয়ায় এখন সেই হিসাব মিলছে না।
দেউরি গ্রামের ৬৫ বছর বয়সী জেলে নুরু মিয়া বলেন, জীবনের প্রায় পুরোটা সময় সুগন্ধা ও বিষখালী নদীতে মাছ ধরেছেন। নদীতে কোথায় ইলিশ থাকে, কোথায় জাল ফেলতে হয়—দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থাকলেও এবার আগের মতো মাছ পাচ্ছেন না। সারাদিনে কখনো এমন পরিমাণ মাছও পাওয়া যায় না, যাতে নৌকার তেলের খরচ উঠে আসে। সামনে নিষেধাজ্ঞা শুরু হলে সংসার ও ঋণের কিস্তি কীভাবে চলবে, তা নিয়েই দুশ্চিন্তায় তিনি।
একই কথা আকাববর মৃধা, কাদের মাঝি ও আখের আলীর। তাদের ভাষ্য, মাছ কম হলেও নৌকার তেল, জাল, বরফ ও অন্যান্য খরচ ঠিকই হচ্ছে। এর সঙ্গে রয়েছে এনজিওর কিস্তি ও মহাজনের দাদনের চাপ। নিষেধাজ্ঞা শুরু হলে মাছ ধরার আয় বন্ধ হয়ে যাবে, কিন্তু ঋণের কিস্তি বন্ধ হবে না।
জেলেরা জানান, বছরের কয়েক মাস ইলিশ ধরার আয়ের ওপরই তাদের পরিবারের বড় একটি অংশের জীবনযাত্রা নির্ভর করে। তাই মৌসুমের শেষ সময়ে এসে নদীতে কাঙ্ক্ষিত ইলিশ না পাওয়ায় সামনে আরও কঠিন সময়ের আশঙ্কা করছেন তারা।
ঝালকাঠি জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলায় ইলিশ আহরণ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছায়নি। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এনামুল হক জানান, দেশের অন্যান্য নদ-নদীতে তুলনামূলক বেশি ইলিশ ধরা পড়লেও সুগন্ধা ও বিষখালীতে ইলিশের উপস্থিতি কম। নদীর পানিদূষণ ও পলি জমার কারণে এমনটি হতে পারে বলে ধারণা করছেন তিনি।
নদীর পাড়ে বাঁধা নৌকা আর শুকাতে দেওয়া জালের সঙ্গে এখন জড়িয়ে আছে জেলেদের ঋণ, সংসার আর ভবিষ্যতের চিন্তা। নিষেধাজ্ঞার আগে নদীতে ইলিশের ঝাঁক ফিরবে—এই আশাতেই এখন শেষ সময়টুকুর অপেক্ষায় তারা।