রবিবার, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬
No menu items!
spot_img

দখল, দূষণ ও নাব্য সংকটে অস্তিত্ব হারাচ্ছে বরিশালের নদ-নদী

‘ধান-নদী-খাল, এই তিনে বরিশাল’— ঐতিহ্যবাহী এই প্রবাদটি এখন কেবলই বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ। কালের বিবর্তনে দখল, দূষণ, অপরিকল্পিত উন্নয়ন আর নদীশাসনের অভাবে বরিশালের ঐতিহাসিক নদ-নদীগুলো আজ অস্তিত্ব হারাচ্ছে। একসময় যেসব নদীতে দূরপাল্লার বড় বড় যাত্রীবাহী লঞ্চ ও পণ্যবাহী জাহাজ সগর্বে চলত, নাব্য সংকটে সেখানে এখন ছোট ট্রলারও চলতে পারছে না। খরস্রোতা এই জলপথগুলো এখন পরিণত হয়েছে মরা খালে।

সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বরিশাল সদর, বাকেরগঞ্জ ও নলছিটির ওপর দিয়ে প্রবাহিত ৪১ কিলোমিটার দীর্ঘ খয়রাবাদ নদীটি এখন মৃতপ্রায়। স্থানীয়রা জানান, ২০১১ সালে কীর্তনখোলা ও খয়রাবাদ ব্রিজ নির্মাণের পর নদীর মুখে ডুবোচর জেগে এটি খালে পরিণত হয়েছে। শীত বা শুষ্ক মৌসুমে এখানে নৌকা চলাচলেরও উপায় থাকে না।

একই অবস্থা হিজলার লতা নদীর। একসময় ঢাকা-বরিশাল রুটের বড় লঞ্চ এই নদী দিয়ে চললেও গত ২২ বছর ধরে তা পুরোপুরি বন্ধ। উজিরপুরের ঐতিহ্যবাহী কঁচা নদী, যেখানে একসময় দেড়শ বছরের পুরোনো নৌকাবাইচ হতো, সাতলা ব্রিজ নির্মাণের পর সেটিও এখন গতিপথ হারিয়ে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।

অন্যদিকে, বাকেরগঞ্জের ২২ কিলোমিটার দীর্ঘ শ্রীমন্ত নদীটি দখল ও দূষণে এতটাই সংকুচিত হয়েছে যে, মানুষের কাছে এটি এখন ‘শ্রীমন্ত খাল’ নামে পরিচিত। এছাড়া আড়িয়াল খাঁ নদের শাখা পালরদী নদী একসময় ঢাকা-গৌরনদী নৌরুটের প্রধান মাধ্যম হলেও, পদ্মা সেতু চালুর পর যাত্রী কমার পাশাপাশি পলি জমে নদীটি ভরাট হয়ে যাচ্ছে।

নদীগুলোর এই করুণ দশা সম্পর্কে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) বরিশাল বিভাগীয় সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট লিংকন বাইয়েন বলেন, “সরকারের সর্বশেষ সমীক্ষা অনুযায়ী বরিশাল বিভাগে একসময় ১৪০টি নদীর অস্তিত্ব ছিল। অপরিকল্পিত ব্রিজ নির্মাণ, নদীর মুখে বাঁধ এবং নদীশাসনের অভাবে এসব নদী আজ বিপন্ন। নদীর গতিপথ স্বাভাবিক করতে অবিলম্বে ড্রেজিং ও নদীশাসন জরুরি।”

বিআইডব্লিউটিএ’র বরিশাল বন্দর নিয়ন্ত্রক মো. আসাদুজ্জামান জানান, সড়কপথের অভাবনীয় উন্নয়নের কারণে নৌপথের ওপর চাপ কমেছে ঠিকই, তবে নৌপথ বন্ধ হওয়ার প্রধান কারণ নদীর নাব্যতা সংকট। পলি জমে নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় লঞ্চ বা জাহাজ চলতে পারছে না। এগুলো সচল রাখতে নিয়মিত ড্রেজিং প্রয়োজন।

নদী উদ্ধারের বিষয়ে বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী জাবেদ ইকবাল বলেন, “বরিশাল জেলায় বর্তমানে ছোট-বড় মিলিয়ে ৭১৬ কিলোমিটার আয়তনের ৩৮টি নদ-নদী রয়েছে। নদীশাসন অত্যন্ত ব্যয়বহুল একটি বিষয়। আপাতত মরে যাওয়া ছোট নদীগুলো উদ্ধারে আমাদের কাছে কোনো পরিকল্পনা নেই, তবে খাল খননের একটি বড় প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে। নদীর হারানো ঐতিহ্য ফেরাতে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের উদ্যোগ প্রয়োজন।”

সংশ্লিষ্টদের মতে, কেবল খাল খনন নয়, নদীমাতৃক বরিশালের প্রাণ এই নদ-নদীগুলোকে বাঁচাতে হলে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও পরিকল্পিত নদীশাসন। অন্যথায়, মানচিত্র থেকে অচিরেই হারিয়ে যাবে বরিশালের ঐতিহ্যবাহী অনেক জলপথ।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular