রবিবার, আগস্ট ১৬, ২০২৬
No menu items!
spot_img

ফ্যামিলি কার্ড শুমারির তালিকায় ছাত্রদল, ছাত্রলীগ ও যুবদলের নেতাদের নাম

ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলায় ফ্যামিলি কার্ড শুমারির সুপারভাইজার ও তথ্য সংগ্রহকারী পদে ব্যাপক দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের কথা থাকলেও বাস্তবে পদগুলোতে স্থানীয় ছাত্রদল, ছাত্রলীগ, যুবদল ও নেতাকর্মীদের আত্মীয়স্বজনদের প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সাম্প্রতিক নানা অনিয়ম ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার পর ক্ষমতাসীন দলের আস্থাভাজন হতে পুরো উপজেলায় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী ও ছাত্রলীগের লোকজনদের ফ্যামিলি কার্ড শুমারিতে নিয়োগ দিয়েছেন রাজাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিফাত আরা মৌরি।

রাজাপুর উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২২ জুলাই ‘রাজাপুর উপজেলা ফ্যামিলি কার্ড শুমারি-২০২৬’-এর তথ্য সংগ্রহকারী নির্বাচন কমিটির সদস্য সচিব ও উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. মোজাম্মেল স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে উপজেলার ৬টি ইউনিয়নে তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়।

বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, সুপারভাইজার পদে এবং তথ্য সংগ্রহকারী পদে প্রায় সাড়ে পাঁচশতর বেশি জন আবেদন করেন। সমাজসেবা অধিদপ্তরের নির্দেশনায় ব্যবহারিক দক্ষতা, মৌখিক পরীক্ষা ও জিপিএ নম্বরের ভিত্তিতে ফল নির্ধারণের কথা ছিল।

গত ৯ আগস্ট সন্ধ্যায় ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহের জন্য স্বেচ্ছাসেবী নির্বাচন কমিটির সভাপতি ও ইউএনও রিফাত আরা মৌরি এবং সদস্য সচিব মো. মোজাম্মেল এর স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করা হয়। তালিকায় ৯০ জন তথ্য সংগ্রহকারীর মধ্যে প্রাথমিক নির্বাচিত ৫১জন রিজার্ভ ৫জন এবং অপেক্ষমাণ ৩৪জন। এছাড়া ও ১০ জন সুপারভাইজার মধ্যে ৫জন প্রাথমিক নির্বাচিত ১জন রিজার্ভ এবং ৪জন অপেক্ষমাণ পদে নির্বাচিত করা হয়েছে।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের সামাজিক নিরাপত্তা শাখার নিয়ম অনুযায়ী, ব্যবহারিক পরীক্ষা, জিপিএ, আচরণ ও ভাইভায় উত্তীর্ণদের নির্বাচিত করার কথা থাকলেও অভিযোগ উঠেছে, সরকারদলীয় নেতাদের বিশেষ সুপারিশেই অধিকাংশ পদে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী, তাদের সন্তান ও ঘনিষ্ঠদের নির্বাচিত করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ঝালকাঠি -১ আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম জামাল হস্তক্ষেপে নিয়োগ প্রকৃয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। সুপারভাইজার পদে কাকে নেওয়া হবে সেটা আগেই উপজেলা বিএনপি ও যুবদলের নেতারা তালিকা করে নির্ধারণ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া তথ্য সংগ্রহকারী আবেদনে শুক্তাগড় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকা শারমিন আক্তারের আবেদনে একই ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মো. রেজওয়ান হোসেন তার সীল সাক্ষর দিয়ে লিখিত সুপারিশ করেন।

এছাড়া মুহাম্মদ মাহফুজ আহম্মেদের আবেদন পত্রে সীল সাক্ষরসহ লিখিত সুপারিশ করেন গালুয়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি। তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায় টাকার বিনিময়ে কি সুপারিশের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে? উপজেলার রাজাপুর সদর ইউনিয়নে সুপারভাইজার করা হয়েছে সদর ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি পদে প্রার্থী এমপির ঘনিষ্ঠ মো. নূর হোসেন হৃদয় ওরফে চশমা সুমনকে।

জানা গেছে, এই সুমন এমপির ঘনিষ্ঠ হওয়ায় উপজেলার বিভিন্ন দপ্তরের ব্যাপক সুযোগ সুবিধা নিচ্ছেন। তিনি কোন চাকুরী করেন না। এমনকি তার স্ত্রী বাগেরহাট জেলায় ব্রাকে চাকুরী করতেন। যখন রফিকুল ইসলাম জামাল ধানের শীষের প্রতিক পেয়ে নির্বাচনে আসেন তখন তার স্ত্রীর চাকুরী ছেড়ে রাজাপুর নিয়ে আসেন। রাজাপুরে একটি ভাড়া বাসায় থাকেন। সন্তানদের লেখাপড়া করান নিজে একটি মোটরসাইকেল ব্যবহার করেন অথচ তিনি কোন চাকুরী করেন না। সাধারন মানুষের প্রশ্ন থেকে যায় তার আয়ের উৎস নিয়ে।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, রাজাপুর সদর ইউনিয়নে তথ্য সংগ্রহকারী হয়েছেন সদর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মো. সাকিব আল হাসান শান্ত, সদর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি প্রার্থী মো. তরিকুল ইসলাম। তথ্য সংগ্রহকারী আবেদনে শিক্ষাগত যোগ্যতার সত্যায়িত সনদ দেওয়ার নিয়ম থাকলেও ছাত্রদলের ওয়ার্ড সভাপতি প্রার্থী মো. আব্দুল হাই তিনি সেই নিয়ম না মেনেই আবেদন করেও নিয়োগ পান। শুক্তাগড় ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মো. মিজানুর রহমান, ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. শাকিল একই ইউনিয়নে উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক নাসিম উদ্দিন আকনের ভাতিজা মো. হিমেল আকন। এছাড়া গালুয়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতির সীল সাক্ষর সহ আবেদন পত্রে লিখিত সুপারিশে নেওয়া হয় মুহাম্মদ মাহফুজ আহম্মেদ নামে একজনকে। এছাড়া নিয়োগ পেয়েছেন আওয়ামী লীগের কর্মী মো. দেলোয়ার হোসেনের মেয়ে সাদিয়া বিনতে হোসাইন তিথি।

স্থানীয় বিএনপির একাংশের একাধিক নেতাকর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, যাদেরকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তাদের অনেকের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে। এমপির ১১ খলিফার মধ্যের লোকজন এই কাজ করেছেন। তারা উপজেলা প্রশাসনকে ম্যানেজ করে অযোগ্য লোকদের এই নিয়োগ দিয়েছেন। এখানে অনেক শিক্ষিত যোগ্য অভিজ্ঞ লোকজন আবেদন করেছে অথচ তাদের নেওয়া হয়নি। এরকম চলতে থাকলে বিএনপির পরবর্তীতে অস্তিত্ব সংকটে পড়বে।

নিজের নিয়োগ এবং অন্যদের সুপারিশের বিষয়ে রাজাপুর সদর ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি প্রার্থী মো. নূর হোসেন হৃদয় ওরফে চশমা সুমন বলেন, আমি শুমারিতে মেধার ভিত্তিতে যোগ্য হয়েই নির্বাচিত হয়েছি। এখানে কোনো দলীয় বিবেচনা ছিল না। অধিকাংশ প্রার্থীর যোগ্যতা না থাকায় তারা বাদ পড়েছে যার জন্য এখন আমার প্রতিপক্ষ আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা কথা বলছেন।

দলীয় সুপারিশের অভিযোগ অস্বীকার করে রাজাপুর উপজেলা যুবদলের আহবায়ক মাসুম বিল্লাহ পারভেজ বলেন, ফ্যামিলি কার্ডের শুমারিতে আমার কোনো আত্মীয়স্বজন চান্স পায়নি। প্রশাসন শতভাগ মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ দিয়েছে, আমাদের কোনো সুপারিশ কাজ করেনি।

এদিকে পরীক্ষা দিয়ে টাকা ও সময় নষ্ট হওয়া সাধারণ আবেদনকারীদের অভিযোগ, মেধার আশ্বাস দিয়ে তাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে এবং প্রকাশ্যে দলীয়করণ করা হয়েছে। আবেদন কারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে উপজেলা প্রশাসনকে নিয়ে বিভিন্ন রকমের পোস্ট দিচ্ছেন।

ফ্যামিলি কার্ড তথ্য সংগ্রহ কমিটির সদস্য সচিব ও উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. মোজাম্মেল বলেন, ভাইভা বোর্ডের মাধ্যমে রেজাল্ট শতভাগ মেধার ভিত্তিতে মেধাবীদের বেছে নেওয়া হয়েছে। কাউকে সুপারিশে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। তবে গালুয়া ইউনিয়নের আবেদন পত্রে বিএনপির সভাপতির সীল সাক্ষর দিয়ে লিখিত সুপারিশ থাকায় তাকে নেওয়া হয়েছে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ওই ব্যাক্তি ভাইভা পাস করেছেন যার জন্য তাকে নেওয়া হয়েছে। এছাড়া যারা নিয়ম না মেনে আবেদন করেছে শিক্ষাগত যোগ্যতা কম তাদেরকেও নিছেন কিন্তু যারা নিয়ম মেনে আবেদন করেছে শিক্ষাগত যোগ্যতা বেশি তাদের নিলেন না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, নিয়ম না মেনে আবেদন করলে বাদ দেওয়া হবে এমন তো লেখা নাই।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে গেলে ইউএনও রিফাত আরা মৌরিরকে পাওয়া যায় না এরপর মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি বলেন, সকল নিয়ম মেনেই নিয়োগ সম্পন্ন করা হয়েছে। কারো কোন অভিযোগ থাকলে সে লিখিত আকারে দিলে বিষয়টি দেখা হবে।

এ বিষয়ে ঝালকাঠি-১ (রাজাপুর -কাঁঠালিয়া) আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম জামাল বলেন, ‘এই নিয়োগ ৪৫ দিনের জন্য, তথ্য সংগ্রহকারীরা বাড়ি বাড়ি যাবে, তাদের সকল যোগ্যতার যাচাই করেছে নিযোগ বোর্ড। আমি এ নিয়োগের বিষয়ে কোনো হস্তক্ষেপ করিনাই। একটি মহল ফ্যামিলি কার্ডকে বিতর্কিত করার জন্য এই নিয়োগে ঢুকতে চেয়েছিলো। তা তারা পারেনি। তাই এখন মিথ্যা রটাচ্ছে। রাজাপুরে ছাত্রলীগের এক নেতা এই নিয়োগে চুরান্ত হয়েছে এমন প্রশ্নে এমপি বলেন সবাই বাংলাদেশের নাগরীক। তবে যদি কোনো অপরাধে জড়িত ব্যক্তি নিয়োগ পায় তার দায় নিয়োগ বোর্ডের।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular