রবিবার, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬
No menu items!
spot_img

দক্ষিণবঙ্গের প্রথম মহিলা মাদ্রাসা: ২৮ বছরের পথচলা ও একজন মহীয়সীর বিদায়

দক্ষিণবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী বরিশালের সর্বপ্রথম মহিলা দ্বীনি শিক্ষা মারকাজ ফজিলাতুন্নেছা মহিলা মাদ্রাসা। এই মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৯৮ সালের শেষ দিকে। মাদ্রাসাটি এমন এক সময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যখন খাস পর্দার সাথে মহিলাদের কোনো দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল না বরিশাল বিভাগে। ওই সময়ে আমাদের মুসলিম মা বোনেরা দ্বীনি শিক্ষায় শিক্ষিতা হবেন, কুরআনের হাফেজা হবেন, ক্বারিয়া হবেন বা আলেমা হবেন এরকম কোনো ব্যবস্থাই ছিল না। কারণ, মেয়েদের আবাসিক মহিলা মাদ্রাসা পরিচালনা করা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

অতএব, আমি সবেমাত্র ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসা থেকে পড়াশোনা শেষ করে দেশে ফিরেছি। দেওবন্দ যাওয়ার পূর্বে এক বছর ঢাকাতে অবস্থিত ‘দাওয়াতুল ইসলাম মহিলা মাদ্রাসা’ (সবুজবাগ, কমলাপুর) যেই মাদ্রাসা হযরত মাওলানা মরহুম সাইয়েদ রশীদ আহমেদ ফেরদৌস রহমাতুল্লাহি আলাইহি কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ওই মাদ্রাসায় আমি তিরমিযী ও মুসলিম শরীফের দরস দিতাম।

ওই বছর আমার অত্যন্ত স্নেহের ছোট বোন মরহুমা আলেমা মরিয়ম জাহান রায়হানা প্রধান শিক্ষিকা ও পরিচালিকা, ফজিলাতুন্নেছা মহিলা মাদ্রাসা, বরিশাল, তিনি ওই মাদ্রাসায় দাওরায়ে হাদীস পড়েছেন। আমি একদিকে বড় ভাই ছিলাম, ছোটবেলা থেকেই তাকে অত্যন্ত স্নেহ-ভালোবাসা দিয়ে বড় করেছি; অন্যদিকে তার ওস্তাদ ছিলাম। আমার নিকট সে অনেক কিতাব পড়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য তিরমিযী শরীফ, মুসলিম শরীফ, তাফসীরে জালালাইন ইত্যাদি।

সে ছোটবেলা থেকেই অত্যন্ত মেধাবী, মুত্তাকী ও উত্তম চরিত্রের অধিকারী ছিল। কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ ডিগ্রী দাওরায়ে হাদীসের পাশাপাশি চরমোনাই আলিয়া মাদ্রাসা থেকে কামিল সম্পন্ন করেছেন এবং বোর্ডে স্ট্যান্ড করেছেন। তার ব্যবহার এত সুন্দর ছিল যে সবাই তার ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে যেত। পর্বতসম ধৈর্য ছিল তার; ছোটবেলা থেকেই সে শান্ত, ভদ্র, বুদ্ধিমতী, বিচক্ষণ ও ইলমপিপাসু ছিল। আল্লাহ তাআলা তাকে একজন যোগ্য ও খোদাভীরু আলেমা হিসেবে কবুল করেছিলেন।

🔴মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত ও মুরুব্বীদের দোয়া

১৯৯৭ সনে যখন তিনি ঢাকা থেকে দাওরায়ে হাদীস সমাপ্ত করেন এবং আমি ১৯৯৮ সনে দেওবন্দ থেকে পড়াশোনা সমাপ্ত করে দেশে আসি, তখন আমিও আমার বোন ও ভগ্নিপতি মাওলানা নাসির উদ্দিন মাহমুদ খান (বর্তমান প্রিন্সিপাল, ফজিলাতুন্নেছা মহিলা মাদ্রাসা) খাস পর্দা রক্ষা করে বরিশালে একটি আবাসিক মহিলা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার পরামর্শক্রমে সিদ্ধান্ত নিই।
এবং আমার শ্রদ্ধেয় মামুজান, চরমোনাইয়ের মরহুম পীর সাহেব হযরত মাওলানা সাইয়েদ ফজলুল করীম রহমাতুল্লাহি আলাইহি এর দোয়া ও ইজাজতক্রমে মাদ্রাসার কার্যক্রম শুরু করি এবং মামুজানকে মাদ্রাসার প্রধান পৃষ্ঠপোষক নির্ধারণ করি। পাশাপাশি এই মাদ্রাসার প্রধান মুরুব্বী হিসেবে আমার আব্বাজান হযরত মাওলানা ইউসুফ আলী খান রহমাতুল্লাহি আলাইহি কে নির্ধারণ করা হয়। যিনি চরমোনাই কামিল মাদ্রাসার ভাইস প্রিন্সিপাল ও প্রিন্সিপাল পদে দীর্ঘ প্রায় ৫০ বছরের অধিক সময় দায়িত্ব পালন করেছেন। তার জীবদ্দশায় এই মহিলা মাদ্রাসায় তিনি ইবনে মাজাহ শরীফ পড়াতেন, মাদ্রাসার ‘মুরুব্বী হুজুর’ নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি সর্বপ্রথম মাদ্রাসার টুল, টেবিল, ফার্নিচার ক্রয় করার জন্য ও পোস্টার ছাপানোর জন্য অর্থ প্রদান করেন। এবং আমার ভগ্নিপতি অর্থ প্রদান করেন।

🔴কঠিন সংগ্রাম ও শুরুর দিনগুলো

বরিশালে মহিলা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করা ছিল তখন আমার জীবনের এক কঠিন যুদ্ধ। সময়টা ছিল ১৯৯৮ এর শেষ দিকে। বরিশাল শহরের হাতেম আলী চৌমাথা সংলগ্ন বিএডিসি অফিসের পূর্ব পার্শ্বে, সিএন্ডবি রোডের পাশে মরহুম খন্দকার সোহরাব হোসেনের তিনতলা ভবনটি মাসিক ১৩,০০০ টাকা ভাড়ায় নিয়ে মাদ্রাসার কার্যক্রম শুরু করি।
শুরুটা ছিল অনেক কষ্টকর ও আমার জীবনের অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। আমি ও আমার ভগ্নিপতি মাওলানা নাসির উদ্দিন সাহেব আমরা দুজন শুধুমাত্র ভ্যান ভাড়া করে রাতে দিনে সমস্ত বরিশাল শহরে মাদ্রাসার পোস্টার লাগাতাম, লিফলেট বিলি করতাম। এভাবেই শুরু করলাম মাদ্রাসার কার্যক্রম।
আল্লাহ পাকের অশেষ মেহেরবানীতে ও আল্লাহ পাকের ওই জমানার শ্রেষ্ঠ ওলিয়ে কামেল চরমোনাইয়ের মরহুম পীর সাহেব রহমাতুল্লাহি আলাইহির দোয়া ও আমার আব্বাজান রহমাতুল্লাহি আলাইহির দোয়ায় আল্লাহ পাক সমস্ত কাজ সহজ করে দিয়েছেন। মরহুম পীর সাহেব রহমাতুল্লাহি আলাইহি চরমোনাইয়ের বাৎসরিক দুটি মাহফিল সহ বরিশাল বিভাগের তার প্রত্যেক মাহফিলে এই মাদ্রাসার প্রচার করতেন। তিনি মাহফিলে ঘোষণা দিতেন যে, “আমার ভাগিনা, ভাগ্নি ও ভাগ্নি-জামাতা বরিশালে মহিলা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন, আপনারা এখানে ছাত্রী ভর্তি করাবেন।” আলহামদুলিল্লাহ, মামুজান রহমাতুল্লাহি আলাইহির দোয়া ও সীমাহীন আন্তরিকতার কারণে প্রথম বছরই ১৬০ জন ছাত্রী ভর্তি হয় এবং প্রথম বছর নাহবেমীর জামাত পর্যন্ত খোলা হয়। এভাবে প্রায় পাঁচ বছর পর্যন্ত বরিশালের অধিকাংশ মাহফিলে তিনি এই মাদ্রাসার প্রচার করতেন।

তার জীবদ্দশায় তাকে প্রধান অতিথি বানিয়ে সিএন্ডবি রোডে একবার ও হাতেম আলী কলেজ ময়দানে একবার ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন করা হয়। এই মাহফিলে বর্তমান পীর সাহেব, আমার শ্রদ্ধেয় বড় ভাই হযরত মাওলানা সাইয়েদ রেজাউল করীম তিনি উপস্থিত থেকে বয়ান পেশ করেছিলেন।
আমার মামুজান মরহুম পীর সাহেব রহমাতুল্লাহি আলাইহি এর ওই মাহফিলে এত পরিমাণ লোক উপস্থিত হয়েছিল যা দেখে তিনি অনেক খুশি হয়েছিল। তখন বরিশাল শহরের কোনো মাহফিলে ইতিপূর্বে এত লোক দেখা যায়নি। ওই মাহফিলে তিনি ফজিলাতুন্নেছা মহিলা মাদ্রাসার জন্য কেঁদে কেঁদে দোয়া করেছিলেন হে আল্লাহ আপনি এই মাদ্রাসার জন্য নিজস্ব জায়গা ও ভবনের ব্যবস্থা করে দিয়েন। ওই সময় স্টেজে আমি তার পাশেই বসা ছিলাম।
আল্লাহ পাক তার ওই ওলীর দোয়া, আব্বাজান রহমাতুল্লাহি আলাইহির দোয়া, আমার আম্মাজান যিনি চরমোনাই দরবারের প্রতিষ্ঠাতা আল্লামা সাইয়েদ ইসহাক রহমাতুল্লাহি আলাইহির কন্যা, তিনিও সবসময় চোখের পানি ফেলে এই মাদ্রাসার জন্য দোয়া করতেন আরো অসংখ্য আল্লাহওয়ালাদের চোখের পানি ও দোয়ার বরকতে আজ এই ইলমের বাগানকে আল্লাহ কবুল করেছেন।

🔴ত্যাগ, সাফল্য ও প্রসারের ইতিহাস

মাদ্রাসার শুরুতে অনেক ত্যাগ ও কুরবানী ছিল আমার, আমার ভগ্নিপতি ও আমার বোনের। আমার বোন মরিয়ম জাহান রায়হানা ও আমার ভগ্নিপতি এই মাদ্রাসার জন্য সকল আরাম-আয়েশ বিসর্জন দিয়েছিলেন। এভাবে দীর্ঘ আট বছর পর ২০০৬ সালে সর্বপ্রথম ছয় জন মেয়ে দাওরায়ে হাদীস (মাস্টার্স ডিগ্রী) সমাপ্ত করেন এই মাদ্রাসা থেকে এবং এই আট বছরে অনেক ছাত্রী হাফেজা ও ক্বারিয়া হয় এই মাদ্রাসা থেকে। ওই সময় এই মাদ্রাসায় আবাসিক-অনাবাসিক প্রায় ৩ থেকে ৪ শত ছাত্রী ছিল।
২০০৬ থেকে প্রতি বছর নিয়মিত ১০, ১৫, ২০, ২৫, ৩০ জন ছাত্রী প্রতি বছর এই মাদ্রাসা থেকে দাওরায়ে হাদীস সমাপ্ত করতে থাকে, পাশাপাশি অনুরূপ সংখ্যক হাফেজা ও ক্বারিয়া হতে থাকে। ১৯৯৮ ইংরেজি সাল থেকে ২০২৬ পর্যন্ত ১,০০০-এর অধিক আলেমা, হাফেজা ও ক্বারিয়া এই মাদ্রাসা থেকে তৈরি হয়েছে।

মাদ্রাসার শুরু লগ্ন থেকেই মাদ্রাসার মনোরম আবাসিক ব্যবস্থা ও খাবারের মান ভালো ছিল এবং যোগ্য শিক্ষক ও শিক্ষিকা দ্বারা ছাত্রীদের পাঠদান ও চরিত্র গঠনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল, যার ফলে এই মাদ্রাসার সুনাম সুখ্যাতি সমস্ত বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। সুদূর বরগুনা, পাথরঘাটা, ভোলা, পিরোজপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুর, বরিশাল শহরের জেলা, উপজেলা, থানা ও সুদূর গ্রাম অঞ্চল থেকে এই মাদ্রাসায় ছাত্রী ভর্তি হতো ইলমে নববী অর্জন করার জন্য।

এই মাদ্রাসার সব থেকে বড় গুণ হলো একদিকে যেমন ছাত্রীরা যোগ্য আলেমা হয়েছে, অনুরূপ আমলদার হয়েছে। এটার মূল কারণ ছিল আল্লাহ পাকের ওলীদের দোয়ার ফসল ও আলেমা মরিয়ম জাহান রায়হানার অক্লান্ত পরিশ্রম। সে নিজের জীবনের আরাম-আয়েশকে বিসর্জন দিয়েছিল এই মাদ্রাসার জন্য, তার সর্বোচ্চ ত্যাগ ছিল। তার তাকওয়া, তার ইখলাস, সে নিয়মিত তাহাজ্জুদগুজার ছিল। মাদ্রাসা কে সে নিজের জীবনের থেকেও বেশি ভালোবাসতো। তার সুন্দর আমল, তাকওয়া ও ইখলাসের কারণে এই মাদ্রাসার ছাত্রীরাও আমলদার হয়েছে। আল্লাহ তাআলা এই মাদ্রাসাকে কবুল করেছেন।

🔴পরিচালনা পর্ষদ ও নিজস্ব ভবনে স্থানান্তর

২০১০ সাল পর্যন্ত আমি অত্র মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা ও প্রিন্সিপাল ছিলাম। ২০১০ সালে আমার ভগ্নিপতি মাওলানা নাসির উদ্দিন মাহমুদ খান কে প্রিন্সিপালের দায়িত্ব প্রদান করি, যিনি ইতিপূর্বে ভাইস প্রিন্সিপাল ছিলেন। এবং ওই বছর আমি ঢাকা গাজীপুর কোনাবাড়িতে ‘মারকাজুল এহসান মহিলা মাদ্রাসা’ নামে আরও একটি মহিলা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করি, যে মাদ্রাসা থেকে অনেক ছাত্রী হাফেজা ও আলেমা হয়েছে। এবং আমার বোন ও ভগ্নিপতির অনুরোধে ২০১০ সাল থেকে ফজিলাতুন্নেছা মহিলা মাদ্রাসার সভাপতির দায়িত্ব পালন করছি। যেহেতু এই মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ ও পরিকল্পনা এবং ১৯৯৮ সন থেকে দীর্ঘ ১২টি বছর (২০১০ সাল পর্যন্ত) মাদ্রাসার প্রিন্সিপালের দায়িত্ব সুনামের সাথে পালন করেছি, তাই অসংখ্য ছাত্রী আমার কাছে হাদীস ও তাফসীর পড়ে আলেমা হয়েছে এই মাদ্রাসা থেকে।

২০১৬ সাল পর্যন্ত বরিশাল শহরের সিএন্ডবি রোডে অবস্থিত খন্দকার সোহরাব সাহেবের ভবনেই এই মাদ্রাসা পরিচালিত হয়েছিল। ইতিপূর্বে আমার ভগ্নিপতির বড় ভাই জনাব মুস্তাফিজুর রহমান বাদশা, তিনি ও তাঁর অন্যান্য ভাই, বোন ও ভগ্নিপতি তারা সকলে একত্রিত হয়ে তাঁদের পারিবারিক জমি থেকে কয়েক কোটি টাকা মূল্যের জমি মাদ্রাসার নামে দান করেন। শুধু তাই না, এই মাদ্রাসার ভবন নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ দান করেন। মাদ্রাসার নিজস্ব ভবন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পিছনে তাঁদের অবদান অপরিসীম। এই মাদ্রাসার নামকরণ করা হয়েছিল আমার ভগ্নিপতির মায়ের নামে, তাঁর নাম হলো ফজিলাতুন্নেছা। আল্লাহ পাক তাঁর নামকে কবুল করেছেন, আলহামদুলিল্লাহ তিনি এখনো জীবিত আছেন, আল্লাহ পাক তাকে এর উত্তম পুরস্কার দান করুন।

২০১৬ সালে বরিশাল নথুলাবাদ বাস স্ট্যান্ড সংলগ্ন ২৯ নং ওয়ার্ড শাহপরান সড়কে ফজিলাতুন্নেছা মহিলা মাদ্রাসার বর্তমান ছয় তলা নিজস্ব ভবন নিজস্ব জমিতে নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হলে ২০১৬ সালের শুরুতে সিএন্ডবি রোড থেকে নতুন ভবনে মাদ্রাসা স্থানান্তর করা হয়। আলহামদুলিল্লাহ, ২০১৬ সাল থেকে অদ্য ২০২৬ সাল পর্যন্ত মাদ্রাসাটি অত্যন্ত সুনামের সাথে পরিচালিত হচ্ছে।

🔴ওস্তাদবৃন্দ ও শিক্ষকমণ্ডলীর অবদান

যোগ্য শিক্ষক-শিক্ষিকা ও আলেমা রায়হানার যোগ্য পরিচালনার কারণে এই মাদ্রাসায় ভালো ও মেধাবী ছাত্রীরা ভর্তি হয়, যার ফলে প্রতি বছর এই মাদ্রাসা থেকে অসংখ্য ছাত্রী কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরিচালিত বোর্ড পরীক্ষায় স্ট্যান্ড করেছে। এ বছরও প্রায় ৩০ জন ছাত্রী আলেমা হবেন এবং অনেক ছাত্রী হাফেজা হবেন।

এই মাদ্রাসায় দীর্ঘদিন থেকে বুখারী শরীফের দরস প্রদান করেছেন হযরত মাওলানা মুফতি শিব্বির সাহেব হুজুর। ২০০৬ সালে যেই বছর সর্বপ্রথম এই মাদ্রাসা থেকে ছয় জন ছাত্রী আলেমা হয়েছিল, ওই বছরই আমি হযরত মাওলানা মুফতি শিব্বির সাহেব হুজুরকে বুখারী শরীফ পড়ানোর জন্য এই মাদ্রাসায় নিয়ে আসি। তিনি বরিশালে ওলামায়ে কেরামের শিরোমণি, অসংখ্য অগণিত আলেমদের ওস্তাদ, অনেক যোগ্য মানুষ। তিনি এই মাদ্রাসায় দীর্ঘদিন থেকে বুখারী শরীফের দরস দিয়েছেন।
পাশাপাশি মাওলানা শফিকুর রহমান সাহেব, মুফতি আমিনুল ইসলাম সাহেব, মুফতি ফয়জুল্লাহ সাহেব তাঁদেরও যথেষ্ট অবদান রয়েছে ভালো দরস প্রদানের ক্ষেত্রে। বিশেষ করে মুফতি আব্বাস আলী সাহেব ছাত্রীদের উত্তম পাঠদান ও তরবিয়তের ক্ষেত্রে মাদ্রাসার শুরুর দিক থেকে বিশেষ ভূমিকা পালন করে আসছেন।

আমার অত্যন্ত স্নেহের ছোট বোন আলেমা মরিয়ম জাহান রায়হানা ও আমার ভগ্নিপতি মাওলানা নাসির উদ্দিন মাহমুদ খান দীর্ঘ ২৮ বছর এই মাদ্রাসাকে দক্ষতা ও সুনামের সাথে পরিচালনা করে মাদ্রাসাকে আজ এ পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন। তার সাথে দীর্ঘ প্রায় ২৫ বছর যাবত আরো একজন মহীয়সী ও মেধাবী যোগ্য আলেমা, অসংখ্য আলেমার ওস্তাদ আলেমা আয়েশা সিদ্দিকা (‘রাজাপুরের আপা’ নামে পরিচিত) যিনি এই মাদ্রাসার নাজেমে তালীমাত বা শিক্ষা সচিব। তার মাদ্রাসার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম, মাদ্রাসার প্রতি অপরিসীম ভালোবাসা, কঠিন ত্যাগ ও কুরবানী রয়েছে। তিনি আমার বোনের সাথে এই মাদ্রাসা পরিচালনার ক্ষেত্রে সবসময় ছায়ার মতো তার পাশে থেকে ছাত্রীদের তালীম তরবিয়ত দিয়েছেন এবং দিচ্ছেন। আল্লাহ তাআলা তাকে এর বিনিময়ে দুনিয়া ও আখেরাতে দান করুন, তাকে দীর্ঘজীবী করুন ও সুস্বাস্থ্য দান করুন।

বর্তমানে যারা এই মাদ্রাসার শিক্ষক শিক্ষিকা রয়েছেন সবাই যোগ্য, দক্ষ, অভিজ্ঞ ও মেধাবী। মাদ্রাসার প্রতি আন্তরিক। অত্র মাদ্রাসার অধিকাংশই এই মাদ্রাসার ছাত্রী, যার ফলে তারা ছাত্রীদের যথেষ্ট যত্ন সহকারে শিক্ষা প্রদান করেন। এ কারণে অনেক দুর্বল ছাত্রীরা এই মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে পড়াশোনা করে ভালো রেজাল্ট করছে। আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের মাদ্রাসা থেকে যে সকল ছাত্রী আলেমা, হাফেজা ও ক্বারিয়া হয়েছেন, তারা বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে কয়েক শত মহিলা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন। বরিশালের প্রতিটি মাদ্রাসায় আমাদের ছাত্রীরা শিক্ষকতা করছেন।

🔴ছোট ভাই মাওলানা মামুনুর রশিদ খানের অবদান

আমার স্নেহের ছোট ভাই মাওলানা মামুনুর রশিদ খান (হাটহাজারীর ফারেগ) তিনি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার লগ্ন থেকে সুখে দুখে সবসময়ই আমার বোন ও ভগ্নিপতির পাশে থেকে যথেষ্ট সহযোগিতা করেছেন। বর্তমানে তিনি এই মাদ্রাসার সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। মাদ্রাসার জন্য বিভিন্ন সময়ে অনুদান সংগ্রহ করা এবং এই মাদ্রাসার নতুন ভবন নির্মাণের জন্য প্ল্যান পাস করা ইত্যাদি সকল কাজে তার অনেক অবদান রয়েছে। আমার বোনের অবর্তমানে আমার ভগ্নিপতি ও ভাগিনা ভাগ্নিদেরকে সান্ত্বনা, শক্তি ও সাহস দিচ্ছেন এবং সার্বিক সহযোগিতা করে যাচ্ছেন।

🔴মরহুমার পরিবার ও স্বজনদের অবস্থা

আমার ভগ্নিপতি মাওলানা নাসির উদ্দিন মাহমুদ খান তিনি একজন মেধাবী, পরিশ্রমী, ভীষণ ত্যাগী ও অতিথি পরায়ণ মানুষ। তার আতিথেয়তা ও সুন্দর ব্যবহারে সকল আত্মীয় স্বজন, পাড়া প্রতিবেশী ও অভিভাবকবৃন্দ খুশি। এই মাদ্রাসার জন্য সীমাহীন পরিশ্রম করতে করতে এবং তার প্রিয়তমা স্ত্রী আমার বোনের মৃত্যুর শোকে তিনি ভীষণ অসুস্থ। আমার ভগ্নিপতির জন্য আমি সকলের কাছে দোয়া প্রার্থী।

আমার বোন আলেমা রায়হানা তিনি চার সন্তানের মা ছিলেন
বড় মেয়ে আলেমা তাসরিফা
বড় ছেলে হাফেজ মৌলভী ফাইয়াজ
ছোট মেয়ে নাবিহা
ছোট ছেলে নাহিয়ান
বড় মেয়ে বিবাহিত, তার স্বামী হাফেজ মৌলভী তাকী খান মিশরের আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত। আমার বড় ভাগ্নি যথেষ্ট যোগ্য এবং আমার বড় ভাগিনা হাফেজ মৌলভী ফাইয়াজ অনেক মেধাবী ও ব্রিলিয়ান্ট। আমার বোনের অবর্তমানে আশা করি আমার ভাগিনা হাফেজ মৌলভী ফাইয়াজ ও ভাগ্নি আলেমা তাসরিফা তার মায়ের দায়িত্ব সুন্দরভাবে পালন করতে পারবে, সে যোগ্যতা তাদের রয়েছে। ভাগ্নি তাসরিফার জামাতা (আমার স্নেহের ভাতিজা) সেও যোগ্য, শান্ত, ভদ্র ও সুন্দর ব্যবহারের অধিকারী। সে ফাইয়াজ ও তাসরিফাকে মাদ্রাসা পরিচালনার ক্ষেত্রে সবসময়ই পাশে থাকবে।

আমরা ভাই-বোনের মধ্যে প্রথম বোনকে হারিয়েছি। আমার দ্বিতীয় বোন রাবেয়া জাহান রুমা ও ছোট বোন ইফরাত জাহান নাইমা (যিনি এই মাদ্রাসা থেকে আলেমা হয়েছেন) বর্তমানে তারা আমার হারানো বোনের পরিবারের পাশে থেকে সার্বিক সহযোগিতা করে যাচ্ছেন এবং ভবিষ্যতেও করবেন।
আলেমা রায়হানা শুধুমাত্র তার ছেলেমেয়েদের অভিভাবক ছিল না, আমাদের গোটা পরিবারের অভিভাবক ছিল। তিনি এই মাদ্রাসার অভিভাবক ছিলেন, পরিবারের অভিভাবক ছিলেন, আমাদের ভাই-বোনের অভিভাবক ছিলেন, আমার মায়ের অভিভাবক ছিলেন, এমনকি তার শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়-স্বজনও তাকে অভিভাবক মনে করতেন। সকলের মাথার উপর তিনি বটবৃক্ষের মতো ছায়া দিয়ে রাখতেন। আজ আল্লাহর এই প্রিয় বান্দী, মহীয়সী নারী, অপরিসীম গুণের অধিকারী সকলকে দুঃখের সাগরে ভাসিয়ে আল্লাহর কাছে চলে গিয়েছেন। আল্লাহ পাক তাকে শহীদি মর্তবা দান করুন এবং জান্নাতুল ফেরদাউসে তাকে উঁচু মর্যাদা দান করুন।
তার ছাত্রীদের মাধ্যমে জেনেছি, গত বছর খতমে বুখারী অনুষ্ঠানে দোয়ার সময় শহীদি মৃত্যুর জন্য আমার বোন দোয়া করেছিলেন। হয়তো আল্লাহ তাআলা সেটা কবুল করেছেন। আজ তার জন্য তারই হাজার হাজার ছাত্রী, অভিভাবকগণ, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও পাড়া-প্রতিবেশী সকলে তার জন্য দোয়া করতেছেন। আমাদের বিশ্বাস আল্লাহ পাক তাকে জান্নাতে উঁচু মাকাম দান করেছেন।

🔴চরমোনাই পরিবার ও পীর সাহেবগণের আন্তরিকতা

বর্তমান চরমোনাইয়ের পীর সাহেব হযরত সাইয়েদ রেজাউল করীম ও নায়েবে আমীর হযরত মুফতি সাইয়েদ ফয়জুল করীম সাহেব দামাত বারাকাতুহুম তারা দুজন সহ তাদের অন্যান্য ভাইয়েরা ও বোনেরা আমার এই বোনটাকে অনেক বেশি স্নেহ করতেন, অনেক বেশি ভালোবাসতেন। পীর সাহেব চরমোনাই ও নায়েবে আমীর সাহেব দুইজনের মেয়েরা আমার বোনের ছাত্রী। তাদের পরিবারের সাথে আমার বোনের অনেক গভীর সম্পর্ক ছিল, যার ফলে বোনের মৃত্যুতে তারা অনেক বেশি শোকাহত।
গত কয়েক বছর পূর্বে আমার আব্বাজান রহমাতুল্লাহি আলাইহি জীবিত থাকাকালীন বর্তমান পীর সাহেব হুজুর মাদ্রাসার মাহফিলের প্রধান অতিথি ছিলেন। তাছাড়াও তারা প্রায় সময় মাদ্রাসায় এসে মাদ্রাসার খোঁজখবর নিতেন।
আমার বোনের মৃত্যুর খবর শুনে তারা দুজনই সফর থেকে বাড়িতে চলে এসেছেন এবং হযরত পীর সাহেব দামাত বারাকাতুহুম চরমোনাই মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে গত ১৬/০৯/২০২৬ রোজ বুধবার সকালে ফজরের নামাজের পরে জানাজা পড়িয়েছেন। যার ইন্তেকাল হয়েছিল আগের দিন ১৫/০৯/২০২৬ রোজ মঙ্গলবার দুপুর বারোটার দিকে। এবং ১৬ তারিখ দ্বিতীয় জানাজা শেষে ফজিলাতুন্নেছা মহিলা মাদ্রাসার সামনে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
আজ আমরা তার মৃত্যুতে এতটা শোকাহত যা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আমাদের পরিবারের প্রত্যেকটি ব্যক্তি, মাদ্রাসার সকল শিক্ষক-শিক্ষিকা সকলেই ব্যথিত, মর্মাহত, শোকাহত; সকলেই যেন ভাষা হারিয়ে ফেলেছে কষ্টে।

🔴ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও উদাত্ত আহ্বান

ফজিলাতুন্নেছা মহিলা মাদ্রাসায় বর্তমানে আবাসিক-অনাবাসিক প্রায় ৮০০ ছাত্রী রয়েছে। ৩০ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা ও ১০ জন কর্মচারী রয়েছে। বর্তমান মাদ্রাসা ভবনে ছাত্রী সংখ্যা বেশি হওয়ায় ও ছাত্রীদের থাকার জায়গা সংকুলান না হওয়ায় বর্তমান ভবনের সামনে আরো একটি ১০ তলা ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে এবং প্ল্যান পাস করা হয়েছে, আলহামদুলিল্লাহ।
আমাদের এই মাদ্রাসা এতদিন যেভাবে আমার বোনের পরিচালনায় পরিচালিত হয়েছে, ইনশাআল্লাহ অনুরূপ আমার ভাগিনা ও ভাগ্নির পরিচালনায় সুন্দরভাবেই পরিচালিত হবে। এবং যারা শিক্ষক-শিক্ষিকা রয়েছেন তারা অনেক দক্ষ ও অভিজ্ঞ, অতএব আগামী দিনে এ মাদ্রাসা আরো সুন্দরভাবে এগিয়ে যাবে। আমি এই মাদ্রাসার বর্তমান সভাপতি বিগত দিনের থেকে সামনের দিনগুলোতে আমার ভাগিনা ও ভাগ্নির পাশে থেকে এই মাদ্রাসায় আরও বেশি সহযোগিতা করব, ইনশাআল্লাহ।
২০২৬ জানুয়ারিতে আমি ‘মাদ্রাসা আশরাফিয়া কারিমিয়া’ নামে বরিশাল রূপাতলীতে একটি ছেলেদের মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছি। গত জানুয়ারি থেকে নূরানী বিভাগ চালু হয়েছে।
পরিশেষে, এই ফজিলাতুন্নেছা মহিলা মাদ্রাসা থেকে যারা আমার নিকট পড়েছেন এবং যারা আমার বোনের নিকট পড়েছেন গত ২৮ বছরে যারা আলেমা, হাফেজা, ক্বারিয়া হয়েছেন অথবা কিছুদিন পড়েছেন সকল বিগত ও বর্তমান ছাত্রী ও তাদের অভিভাবকবৃন্দ এবং আমাদের বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, হিতাকাঙ্ক্ষী সকলের নিকট অনুরোধ করব আপনারা আমার বোন ও তার ছেলেমেয়েদের জন্য দোয়া করবেন। বিশেষ করে আমার ভগ্নিপতির জন্য যেন তিনি ধৈর্য ধরতে পারেন এবং তার সুস্থতার জন্য দোয়া করবেন।
আমার জন্য দোয়া করবেন, আল্লাহ পাক যেন মৃত্যু পর্যন্ত এই মাদ্রাসার খেদমত করার তাওফীক দান করেন। আপনারা এই মাদ্রাসায় ছাত্রী ভর্তি করাবেন, কারণ আমরা যোগ্য আলেমা ও হাফেজা তৈরি করার জন্য অঙ্গীকারাবদ্ধ।
RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular