পিরোজপুরে দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কলেজ শাখায় এবার উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন সাতজন শিক্ষার্থী। তাদের কেউই পাস করতে পারেননি।এর মধ্যে নাজিরপুরের দিঘিরজান সেকেন্ডারি স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে পাঁচজন এবং পিরোজপুর সদরের কদমতলা জর্জ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে দুজন পরীক্ষায় অংশ নেন। কদমতলা কলেজে তিনজন ফরম পূরণ করলেও একজন পরীক্ষায় অংশ নেননি।
সোমবার (২ নভেম্বর) সরেজমিনে গিয়ে প্রতিষ্ঠান দুটির গিয়ে জানা যায়, নাজিরপুর দিঘিরজান সেকেন্ডারি স্কুল অ্যান্ড কলেজের কলেজ শাখা ২০১৪ সালে পাঠদানের অনুমতি পায়। গত চার বছরের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটিতে পাসের চেয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি।
২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠানটি থেকে ৩৯ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেন ১৮ জন। ২০২৪ সালে ২৭ জনের মধ্যে পাস করেন ১৩ জন। ২০২৫ সালে ১৫ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হন পাঁচজন। সর্বশেষ ২০২৬ সালে মানবিক বিভাগের পাঁচজন পরীক্ষায় অংশ নিলেও কেউ পাস করতে পারেননি।
প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে আটজন শিক্ষক ও দুজন কর্মচারী রয়েছেন।
অন্যদিকে, পিরোজপুর সদরের কদমতলা জর্জ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের কলেজ শাখা ২০২৩ সালে পাঠদানের অনুমতি পায়। শুরু থেকেই প্রতিষ্ঠানটির এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল আশানুরূপ নয়। ২০২৩ সালে ১২ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেন ছয়জন। ২০২৪ সালে সাতজনের মধ্যে পাস করেন তিনজন। ২০২৫ সালে সাতজনের মধ্যে পাস করেন চারজন। চলতি বছর তিনজন পরীক্ষার ফরম পূরণ করলেও অংশ নেন দুজন। তাঁদের কেউই উত্তীর্ণ হতে পারেননি।
প্রতিষ্ঠানটির কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কলেজ শাখাটি নন-এমপিওভুক্ত হওয়ায় সেখানে আলাদা কোনো শিক্ষক নেই। মাধ্যমিক শাখার শিক্ষকেরাই কলেজ শাখার পাঠদান করান। এ বছর নতুন করে কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি। প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক ও স্থানীয় ব্যক্তিদের প্রত্যাশা, কলেজ শাখাটি এমপিওভুক্ত হলে এসএসসি পাস করা শিক্ষার্থীরা এখানেই উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনা করতে আগ্রহী হবেন।
তবে কলেজ শাখার বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটির স্কুল শাখার ফলাফল তুলনামূলক ভালো। গত চার বছরের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৩ সালে ৮৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেন ৭৫ জন। ওই বছর পাসের হার ছিল ৮৯ দশমিক ২৯ শতাংশ। ২০২৪ সালে ৭৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হন ৬৯ জন। পাসের হার ছিল ৯২ শতাংশ। ২০২৫ সালে ৭০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেন ৪৮ জন। পাসের হার দাঁড়ায় ৬৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ। সর্বশেষ ২০২৬ সালে ৫০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন ৪৫ জন। এ বছর পাসের হার ৯০ শতাংশ।প্রতিষ্ঠানটিতে ১৬ জন শিক্ষক ও দুজন কর্মচারী রয়েছেন।
কদমতলা এলাকার অভিভাবক মো. সাইদুল ইসলাম বলেন, গত বছর কলেজটিতে নতুন করে কেউ ভর্তি হননি। আগের বছর ভর্তি হওয়া যে দুজন শিক্ষার্থী ছিলেন, তাঁরাই এ বছর পরীক্ষা দিয়েছেন। তাঁরা গত বছরও অকৃতকার্য হয়েছিলেন, এবারও হয়েছেন। তাই কলেজ শাখার ফলাফল খারাপ হয়েছে। কলেজটি এমপিওভুক্ত হলে এবং সরকারি সুযোগ-সুবিধা পেলে স্থানীয় শিক্ষার্থীরা এখানে ভর্তি হতে আগ্রহী হবেন। এতে ফলাফলও ভালো হবে বলে আশা করি। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটির স্কুল শাখার এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল পিরোজপুর সদর উপজেলার মধ্যে বেশ ভালো।
স্থানীয় আরেক অভিভাবক সুমি আক্তার বলেন, এখানে স্কুল শাখার পাশাপাশি কলেজ শাখার ফলাফলও ভালো হবে বলে তাদের প্রত্যাশা ছিল। তবে তারা জানতে পেরেছেন, গত বছর যারা এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছিলেন, তারাই এবার আবার পরীক্ষা দিয়ে অকৃতকার্য হয়েছেন।
কদমতলা এলাকার দুই বাসিন্দা মো. মাসুম বিল্লাহ ও সুলতানা জেসমিন মাহিনুর বলেন, তারাও এই প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেছেন। স্কুল শাখার ফলাফল বেশ ভালো। ২০২৩ সালে এখানে কলেজ শাখা চালু হয়েছে। কিন্তু কলেজটি এমপিওভুক্ত না হওয়ায় এসএসসি পাসের পর শিক্ষার্থীরা অন্য কলেজে ভর্তি হচ্ছেন। কলেজটি এমপিওভুক্ত হলে স্থানীয় শিক্ষার্থীরা এখানেই উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারবেন। এতে তাঁদের সন্তানদের দূরের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে হবে না। তারা কলেজটি এমপিওভুক্ত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানান।
নাজিরপুর দিঘিরজান সেকেন্ডারি স্কুল অ্যান্ড কলেজের ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের শিক্ষক সুমন বিশ্বাস বলেন, ২০১৪ সালে কলেজটি পাঠদানের অনুমতি পাওয়ার পর থেকে প্রতিবছরই পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। বিগত বছরগুলোতে পরীক্ষার ফলাফল মোটামুটি সন্তোষজনক ছিল। তবে প্রতিষ্ঠানটি নন-এমপিওভুক্ত হওয়ায় শিক্ষকরা সরকারিভাবে কোনো বেতন-ভাতা পান না। ফলে তারা আর্থিক অসচ্ছলতার মধ্যে জীবনযাপন করছেন।
তিনি আরও বলেন, নন-এমপিওভুক্ত হওয়ায় এ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা ভর্তি হতে চান না। তারপরও কলেজটি টিকিয়ে রাখতে প্রতিবছর শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করে কিছু শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হয়। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাসমুখী করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবে উপস্থিতি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। শিক্ষার্থীরা ক্লাস করার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হলেও কলেজে আসেন না। এতে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে এবং পরীক্ষার ফলাফলেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। রোববার ছয়জন শিক্ষক উপস্থিত থাকলেও একজন শিক্ষার্থীও কলেজে আসেনি। শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত না হলে ভালো ফলাফল করা সম্ভব নয়। শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতিই ফলাফল বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ।
কদমতলা জর্জ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. হাফিজুর রহমান বলেন, তাঁদের বিদ্যালয় শাখার ফলাফল ভালো। কলেজ শাখার পাঠদানের অনুমতি পাওয়ার পর থেকে ফলাফলও সন্তোষজনক ছিল। তবে এ বছর নতুন কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি না হওয়ায় ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এ অবস্থার উন্নতি করতে হলে কলেজ শাখাটিকে এমপিওভুক্ত করা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, এটি গ্রাম পর্যায়ের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কলেজ শাখায় পাঠদানের জন্য প্রয়োজনীয় বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নেই। ফলে বিদ্যালয় শাখার শিক্ষকদের দিয়েই কলেজের কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে। কলেজটি এমপিওভুক্ত হলে প্রয়োজনীয় বিষয়ে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হবে। এতে বিদ্যালয় শাখার শিক্ষার্থীদের উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনার জন্য শহরমুখী হতে হবে না। তারা নিজ প্রতিষ্ঠানেই পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারবে। পাশাপাশি শিক্ষার মান উন্নয়নের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক ভালো ফলাফল ধরে রাখা সম্ভব হবে।
এদিকে, বরিশাল মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের অধীন ছয় জেলার মধ্যে এবার এইচএসসি পরীক্ষায় পাসের হারে শীর্ষে রয়েছে পিরোজপুর। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বরিশাল জেলা। তবে গত দুই বছরের ব্যবধানে পিরোজপুরে পাসের হার কমেছে ৩১ দশমিক ৭৮ শতাংশ পয়েন্ট। ২০০৯ সাল থেকে পাওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এবারই জেলায় সর্বনিম্ন পাসের হার।
শনিবার সকালে বরিশাল মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর জেলাভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণ করে এ তথ্য পাওয়া গেছে। এ বছর পিরোজপুর জেলায় এইচএসসি পরীক্ষায় মোট পরীক্ষার্থী ছিলেন ৭ হাজার ৯৮ জন। তাদের মধ্যে পরীক্ষায় অংশ নেন ৬ হাজার ৭৮২ জন। উত্তীর্ণ হয়েছেন ৩ হাজার ৪৯৬ জন। জেলায় পাসের হার ৫১ দশমিক ৫৫ শতাংশ। এ ছাড়া জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৬৬ জন শিক্ষার্থী।
জেলার গত কয়েক বছরের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালে পাসের হার ছিল ৮৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৬৪ দশমিক ০৭ শতাংশে। সর্বশেষ ২০২৬ সালে পাসের হার আরও কমে হয়েছে ৫১ দশমিক ৫৫ শতাংশ।
এ বিষয়ে বরিশাল অঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি, সেসব প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষকদের নিয়ে জেলাভিত্তিক সভা করা হবে। জিরো পাস করা প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশির ভাগই নন-এমপিওভুক্ত। এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে আমরা ব্যবস্থা নিতে পারি, কিন্তু নন-এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের মতো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।প্রতিষ্ঠানগুলোর বিগত দিনের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে একটি সমাধানে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হবে।



